কবি সপ্তর্ষি রায়
সপ্তর্ষি রায়
সত্তর দশকের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় কবিতায় দেখতে পেলাম সাহিত্য সাধনার সুন্দরতম মুখ। পাশাপাশি চলতে থাকে সংগীত সাধনা এবং ফোটোগ্রাফি চর্চা ।কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কবিপত্র ,বাংলার মুখ,সমতট,শিস,শ্লোক,অনুষ্টুপ,সত্তরের কবিতা,আমাদের শিল্প সাহিত্য।কবিতা সাম্প্রতিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছি বেশ কিছু বছর।পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে অন্য শহরে পাড়ি দিতে হয় এবং কবিতা চর্চায় ঘটে কিছুটা শূন্যতা ।প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'এখন এমন দিন ' প্রকাশিত হয় স্পন্দন প্রকাশনী থেকে 1980 তে। তারপর দীর্ঘ ব্যবধানে 'জন্মের ভিটেমাটি' প্রকাশিত হয়২০১৭এবং 'কালপর্ব'২০১৮।
মানবীয় সংবেদন-ই কবিতা
কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়
(ষাটের অন্যতম কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে 'নৌবত' পত্রিকার পক্ষে একান্ত সাক্ষাৎকারে কবি সপ্তর্ষি রায়)
কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় ষাটের দশকের একজন অগ্রগণ্য ও বিশিষ্ট সাহিত্যসেবী। আন্তরিক, উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ। দশকের গণ্ডি পেরিয়ে সকল প্রজন্মের কবি-লেখকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সাবলীল ও প্রাণপূর্ণ। তাঁর সদর্থক সাহচর্য ও উৎসাহ বিভিন্ন পর্বে প্রাণিত করেছে বহু কবি-গল্পকারকে।
জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, সমকালের চেতনায় বিন্যস্ত ইতিহাস পুরাণ কাহিনী, প্রকাশভঙ্গির নৈপুণ্য, নির্মাণ স্বাতন্ত্র্য, ভাষার প্রাণস্পর্শী দৃঢ়তা তাঁর কবিতা, মহাকবিতাকে প্রতিষ্ঠা করেছে অসাধারণ মহিমায়। তিনি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ, সজাগ। উপলব্ধির গভীরতায় কবিতার প্রতিটি পংক্তি সচল বাস্তব।
নৌবত:- কবি বা লেখকের কি কোন সামাজিক ভূমিকা নির্দিষ্ট থাকে ? থাকলে সেটা কী ?
কবি:- কবি বা গদ্যশিল্পীর সামাজিক ভূমিকার চাইতে, মানবিক মূল্যবোধ থাকবে অনেক বেশি। কারণ মানুষই তো তার সব চিন্তা ও চেতনার উৎস ও আশ্রয়। সমাজজীবন নানা রকম হতে পারে। ধর্ম, জীবনযাপন-প্রণালি আশ্রয় করে বহুমুখী জীবনযাত্রা ছড়িয়ে আছে নানা দেশ ও কালে। মানুষ সেই সামাজিক জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে বড় হয়, জীবনযাপন করে। কিন্তু লেখক দেশ-জাতি ছাপিয়ে মানবিক চেতনায় প্রাণিত হয় বলেই, ওমর খৈয়াম, শেক্সপিয়ার, গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথ দেশকাল, জাতি- জীবন ছাড়িয়ে মনুষ্যত্বের সামগ্রিকতায় বিচার্য, তা চিরদিন থাকবে।
নৌবত:- আপনি একটি লেখায় জানিয়েছেন কবি লিখবেন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনকথা। সত্যনিষ্ঠ ও স্বাভাবিক লেখা। আপনি কি মনে করেন এই সময় সে ধরনের কবিতা লেখা হচ্ছে?
কবি:- সত্যনিষ্ঠ ও স্বাভাবিক জীবনই লেখকের আশ্রয়, তার চির জীবনের সম্পদ। রচনার নির্মাণশৈলী তার নিজস্ব হবে অবশ্যই, কিন্তু লেখার বিষয়বস্তু ব্যক্তিজীবনকে সাধারণের জীবনের বিমিশ্রকরণ জাত ও অনুভূতিমার্গে করবে বিচরণ। এছাড়া আর কি নিয়ে লেখক মূল্যবান একটি জীবন জড়িয়ে বেঁচে থাকবে?
নৌবত:- আপনি প্রথম জীবনে ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন।এ কথাটা কি ঠিক? ছবি আঁকা ছেড়ে কবিতা লেখা আপনার অনিবার্য মনে হল কেন?
কবি:- শিশুকাল থেকেই ছবির প্রতি অমোঘ টান ছিল। বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চল, সামান্য বন্দরে আমার জন্ম। বাবা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে পরিত্যক্ত কাগজ ও কালি এনে দিতেন। আমি ছবি আঁকতাম। একজন বাঙালি মহাজনের বাড়ির দেয়ালে টাঙানো থাকতো রবি বর্মার ও নানাজনের প্রিন্ট। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। কলকাতায় এসে ভবানীপুর সাউথ সাবার্বান, ভবানীপুরের বিখ্যাত স্কুলে পড়াশোনা করার সময় ছবি আঁকতাম। যখন স্কুল থেকে কলেজে, 'কবিপত্র' সম্পাদনা করছি, তখনও ছবির প্রতি এতটাই টান ছিল যে শিল্পপ্রেমিক সন্দীপ সরকারের সঙ্গে আলাপ সূত্রে ছবির প্রতি টান অনুভব করতে থাকি। আমার ছবি নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ হলে প্রদর্শনীও হয়। বাড়িতে নীরদ মজুমদার এসেছেন,ছবি নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন শিল্পী পরিতোষ সেন, রবিন মন্ডল, ইশা মহম্মদ প্রভৃতি নামী শিল্পীরা। বের করি "কবিপত্র" চিত্রশিল্পী সংখ্যাও।তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে 'দেশ' পত্রিকার সম্পাদক ডেকে 'দেশ'-র শিল্পসংখ্যায় আমাকে লিখতে বলেন। লিখি ঈশা মহম্মদের ছবি নিয়ে। এই সময় রবিন মন্ডল, প্রকাশ কর্মকার, সুনীল দাস, অসিত পাল আমার উৎসাহদাতা ছিলেন। ছবির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। কিন্তু সেই সময়ে কিছু লেখকবন্ধু বলতে শুরু করেন কবিতাই পবিত্রর প্রকৃত স্থান। ও ভুল করছে। আমিও স্থানাভাব, অর্থাভাবে ছবি আঁকার ইচ্ছা থেকে সরে এসে কবিতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। মনে হতে থাকে এটাই আমার প্রকৃত অবস্থান, প্রকৃত স্থান।
নৌবত:- সমসময়ের শব্দগত মিথ্যাচারের মধ্য থেকে কবি কিভাবে সত্যকে তুলে ধরতে পারেন?
কবি:- প্রকৃত কবি হলেন সত্যদ্রষ্টা। যার সারাটা জীবন সত্যকে আঁকড়ে ধরে, নানা মিথ্যাচারকে মিথ্যা বলে জেনে প্রকৃত জীবন সত্যকে তুলে ধরাই প্রকৃত কবির কাজ। মানুষের সব অর্থে বেঁচে থাকার দিক ও পথ অনুসন্ধান করে যেতে হয় কবিকে, দেখাতে হয় দ্রষ্টার প্রকৃত চোখ দিয়ে প্রকৃত সত্যের চেহারাটা। সাধারণত এটা একজন প্রকৃত সাধকের কাজ। আর একজন সব অর্থে কবি ও সাধক।তার অনুভূত সত্য শব্দে ধরে রাখাই তার কাজ। একজন গুণমুগ্ধ পাঠকই পারে কবির শব্দ বন্ধনকে মুক্ত করে অন্তর্নিহিত সত্যকে বুঝে নেওয়া, অনুভব করা। মিথ্যাচার থেকে কবি দূরে বসবাস করে বলে, তার সত্য চিরদিনের সত্য অনুভব, তা কেউ কেউ বুঝে নিতে পারে।
নৌবত:- কবিতা, সাহিত্যে আপনার বলিষ্ঠ আত্মপ্রকাশ সম্পূর্ণ নতুন ভাষায়, বিষয় ও আঙ্গিকে। দশকের চৌহদ্দি পেরিয়ে আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আপনি কি কোন পূর্ববর্তী কবির (বাংলা বা ইংরেজী) উত্তরাধিকারী ভাবেন? আপনার অনুপ্রেরণা কে বা কি?
কবি:- আমার জীবন মথিত অনুভবকে শব্দের নৈঃশব্দে ধরে রাখার প্রয়াস করে যাচ্ছি। সারা জীবন সবসময় যে সফল হয়েছি তা বলা কঠিন। আমি বাংলা ও অন্যান্য ভাষার প্রকৃত কবিদের নিরন্তর পাঠক সেই স্কুল জীবন থেকেই। যা করেছি, যা ভেবেছি সবই কবিতা নিয়ে। আবার সব সময় সচেতনভাবে ও যে সবকিছু করেছি তাও নয়। চেতনা, অর্ধ-চেতনা ও অচেতনার সমন্বয়ে জীবনের সমগ্রতাকে ধরে রাখতে চেয়েছি। কোন পূর্বসূরীর প্রত্যক্ষ প্রভাব মুক্ত থাকতে চেয়েছি। সমকালীন কবিদের খুব কাছ থেকে, কিন্তু নিজের উপলব্ধ সত্য ও অনুভবকে আঁকড়ে থেকেছি। তাই আমি কবিতাকেই জীবন সত্য বলে মনে করি। জীবন যেমন পর্ব- পর্বান্তরে ছুটে চলে আমিও নানা পর্ব- পর্বান্তরে ছুটে চলেছি। কোথাও থেমে থাকিনি। সেই অনুপ্রেরণা বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিরাই পেছন থেকে দিয়ে চলেছেন আজও।
নৌবত:- আপনার কবিতায় পুরাণ, মিথের প্রসঙ্গ সচেতনভাবেই এনেছেন। এই আখ্যানমূলক আঙ্গিক গ্রহণের পিছনে কি কোন প্রভাব বা কারণ রয়েছে?
কবি:- কিভাবে, কোথা থেকে প্রেরণা আসে কবিতা লেখার তা ব্যাখ্যা করতে পারবো না। মিথ বা পুরাণপ্রতিমা আমাকে প্রাণিত করেছে বিভিন্ন সময়ে। ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায়। আমি না জেনে, বুঝে অনুভব ঋদ্ধ উপলব্ধির দ্বারস্থ হতে চাইনি। কখনো এক একটা মিথ বা পুরাণ সময়ের বা চিরকালের গভীর সত্য বোধকে তাড়িত করেছে।
আমি মগ্ন হতে থেকেছি সেই মহা কবিতা রচনার নিমগ্নতায়। বেহুলা, লখিন্দরের কাহিনী অবলম্বনে সদ্যমৃত একজন পরিচিত মানুষের প্রেরণায় লিখেছি 'শবযাত্রা' 'ভাসান'। কোরানের 'ইবলিস' চরিত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছি 'ইবলিশের আত্মদর্শন'-এ। মহাভারতের পরশুরামের মাতৃহত্যার ঘটনা আমাকে নারীর অসহায়তার দিকটা পরিস্ফুটিত করতে প্রাণিত করেছে। একের পর এক নতুন আঙ্গিকে মহাকবিতা রচনা করেছি। এইসব রচনার আঙ্গিক সম্পূর্ণ নতুন। বাংলা ভাষায় কখনো সৃষ্টি হয়নি। অধ্যাপক হৃষীকেশ মল্লিক ইবলিশের আত্মদর্শন ওড়িয়া ভাষায় অনুবাদ করে পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছেন। এইসব রচনা, চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতির মিশ্রিত এক জগতের সৃষ্টি করেছে। সব চেতন,অর্ধচেতন ও অবচেতনার সৃষ্টি।নৌবত:- 'দর্পণে অনেক মুখ'(১৯৬০) প্রথম প্রকাশের কাল থেকে 'নৈঃশব্দ্যের শব্দ রূপ--- পবিত্রসনেট' (২০১৬) পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে 'ইবলিশের আত্মদর্শন'কে (১৯৭০) বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতায় মানা হয় এক অসাধারণ স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত মহাকবিতা। ইবলিশ কি কবিরই নামরুপ?
কবি:- আমার মহাকবিতা 'ইবলিশের আত্মদর্শন' যখন প্রথম 'সাম্প্রতিক' নামক খুদে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তখনই কবিতাপ্রেমিকদের মধ্যে উৎসাহ দেখেছি প্রবল। আজ আটটি সংস্করণ বেরুবার সময়ও একই উৎসাহ এবং তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
'ইবলিশের আত্মদর্শন'-এর জনপ্রিয়তা সেদিনের মত এই পঞ্চাশ পার হয়েও সমান আছে। তাই তাকে কিংবদন্তি বলে অনেকেই মনে করেন। ইবলিশ কোরানের একটি সাধারন চরিত্র, কিন্তু পড়তে বসে আমি দুঃখী মানুষের জীবনের নানাদিক অনুভব করেছি, আর তা আমার নিজেরও জীবন। তাই আমার সমগ্র জীবন অভিজ্ঞতাই ইবলিশের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। জীবনের নানা পর্বে কবিতা এসেছে নানা রূপ নিয়ে। একই পথে হাঁটার অভ্যাস আমার ছিল না, আজও নেই। তাই 'দর্পণে অনেক মুখ' 'সনেটগুচ্ছ' ইবলিশের আত্মদর্শন', 'বিযুক্তির স্বেদরক্ত' পরশুরাম পর্ব প্রভৃতি কবিতা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুভব এর ফসল বলা যায়।
নৌবত:- পূর্বসূরী কবি বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, তরুণ সান্যাল, রাম বসু, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর সাথে তুলনীয় আরো অনেক অসাধারণ কবি ব্যক্তিত্বের সাথে আপনার নিবিড় যোগাযোগ ছিল। এঁরা আপনার কবিতা, গদ্যরচনা কিভাবে প্রভাবিত করেছে? কোন শিক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এই প্রজন্মের জন্য বলুন।
কবি:-স্কুল জীবন থেকেই কবিতা নিয়ে চর্চা। তাই সেই সময়ের প্রখ্যাত কবিদের পত্রপত্রিকায় কবিতা বেরুলে পড়তাম। তারপরে 'কবিপত্র'(১৯৫৭) প্রকাশের সময় থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁদের সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুতে শবানুগমন করেছি। শ্মশান থেকে ফিরে বুদ্ধদেব বসুর বাড়ি গিয়েছি। তাঁর ব্যথা বেদনার কথা শুনেছি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল স্কুলসূত্রে। তিনি বন্ধুর মত ব্যবহার করতেন আমার সঙ্গে। আর বিষ্ণু দে ছিলেন আমার ঘরের মানুষ। তার অনেক চিঠি এখনো আমার কাছে রয়েছে। 'শবযাত্রা' পড়ে তিনি বলেছিলেন- তোমার বইটি পড়ে তিন রাত্রি আমি ঘুমোতে পারিনি। বীরেনদা, মনীন্দ্র রায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রাম বসু থেকে অলোকরঞ্জন, আলোক সরকার, শক্তিদা, সুনীলদার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল আমার। তবে কারো দ্বারা প্রভাবিত হইনি। সেই মানসিকতাই ছিল না আমার। আমি প্রথম থেকেই মনে করেছি, আমি এসেছি আমার অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও অনুভূতিকে প্রকাশ করতে। সেখানে ভাষা ও রীতি আমাকে গড়ে নিতে হবে। গদ্য লেখার নিজস্ব পদ্ধতি আমি গড়ে নিয়েছিলাম। কারো দ্বারা প্রভাবিত হবার মতন মানসিকতা ছিলনা আমার। প্রভাবিত হয়ে লেখার অনুপ্রেরণা আমার কোনদিনই নেই।
'সনেটগুচ্ছ' সেখানেও কারো প্রভাব রাখিনি। ইচ্ছে মতো করে নিয়েছি, মাত্রা বিভাজন করেছি, যা বাংলা ভাষায় দেখা যাবেনা। 'মহাকবিতা' আমার নিজের নির্মাণ। সাধারণ ব্যক্তিগত জীবনচর্চা আমার কবিতার বিষয় যখন, তখনো পথ খুঁজেছি কিভাবে বলব তাকে। এই জন্য সমস্ত রকম বিজ্ঞাপনী জগৎ থেকে দূরে থেকেছি। তরুণ গদ্যকার কবি ও শিল্পীদের যতটুকু পারি অবাণিজ্যিক পথে হাঁটার প্রেরণা দিয়েছি। শিল্পের বাণিজ্যকরণ হলো চরম ক্ষতিকারক। আজও এই বিশ্বাসে স্থির হয়ে আছি। তাইতো 'কবিপত্র' নামক সম্পূর্ণ সাহিত্যপত্র ৬৩ বছর ধরে প্রকাশ করছি আমি।
নৌবত:-- বাংলা কবিতা সাহিত্যে কবিপত্রের দীর্ঘ ঐতিহ্য পূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য। এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে অন্য কোন মননশীল পত্রিকার অবদান সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই?
কবি:- আগেই বলেছি, লেখার জন্য চাই পূর্ণ স্বাধীনতা। কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের ভাব ও ভাবনার সম্পূর্ণতা গড়ে তুলতে হবে। এই কারণে অত অল্প বয়সে চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও বের করেছি 'কবিপত্র' যেখানে জানা অজানা মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের চিন্তা-চেতনা ও বোধের প্রকাশ ঘটাতে পারে। এই ঐতিহ্য 'কল্লোল' পত্রিকার পরে 'কবিতা' পত্রিকায় গড়ে তুলতে দেখেছি। 'উত্তরসূরি' পত্রিকার নিজস্ব জগৎ ছিল। 'পরিচয়' পত্রিকারও ছিল। একনিষ্ঠ সত্যদর্শী এইসব পত্রিকার অবদান আমার জীবনে অনেক। আজও 'দিবারাত্রির কাব্য' এরকম একটি পত্রিকা,যে আদর্শনিষ্ঠ। অনামী অথচ শক্তিশালী কবি-লেখকদের নিয়ে কাজ করে চলেছে 'দিবারাত্রির কাব্য'। মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের 'শ্লোক' ঠিক এই শ্রেণীর পত্রিকা।এদের উপর নির্ভর করে আছি, থাকতে চাই।
'কৃত্তিবাস' এই রকম ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। আমি কৃত্তিবাস-এ লিখেছি, তৃপ্তিও পেয়েছি। কিন্তু পরে চরিত্র বদল করে। আর আলোক সরকার সম্পাদিত 'শতভিষা' ছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী কাগজ। তবে তার বিশুদ্ধবাদী কবিতার চিন্তা-চেতনা আমার সঙ্গে মিলত না। তাই 'কবিপত্র'-ই হয়ে ওঠে একসময়ে কবিদের পত্রিকা, তাই নাম 'কবিপত্র'।কবিপত্র ঐতিহ্য বিচ্যুত হয়নি কখনো। কিন্তু সৃষ্টিকর্মের স্বাধীনতাকে সে সবচাইতে মূল্য দিয়েছে। চিত্রকলা সংখ্যা, অবাণিজ্যিক গল্প সংখ্যা, পিকাসো সংখ্যা, রবীন্দ্র শতবর্ষ সংখ্যা, বিষ্ণু দে সংখ্যা প্রকাশ করেছে নির্ভীকভাবে। এইসব কাজে আমার পাশে পেয়েছি প্রভাত চৌধুরীকে। একসময় তার আদর্শ আমার আদর্শ ছিল সমমানের। তরুণ সান্যাল, তুষার চট্টোপাধ্যায় স্বাধীন চিন্তা চেতনার মানুষ। শৈবাল মিত্রও। এদের পেয়েছি নানা সময়ে, নানা কাজে, পাশে। তার পরের ইতিহাস সকলেরই জানা। শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
নৌবত:- আপনি এখন কী ভাবছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আপনার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে কিছু বলুন?
কবি:- আমি আমার চিন্তা চেতনার জগত নিয়ে বসে আছি, লিখছি। মানুষই তো সবকিছু সৃষ্টিকর্তা, ভাবনার বাহক। আমার কাজ মানুষ নিয়ে। সারাটা জীবন মানুষের বহুমুখীনতাকে বুঝে নিতে চেষ্টা করেছি। আজও করছি। তাই আমার লেখার কেন্দ্র হল মানুষ। আজকের প্রজন্মের কাছে আমার আবেদন শিল্প শিল্পের জন্য নয়, মানুষের জন্য শিল্পসৃষ্টি। এটা যদি মনে রাখেন তাঁরা তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো তাঁদের কাছে। তাঁদের সৃষ্টিও পরের প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।







Comments
Post a Comment