কবি বিধানেন্দু পুরকাইত


বিধানেন্দু পুরকাইত

জন্ম:- ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৫৯, দক্ষিণ ২৪ পরগণার হরিণডাঙা গ্রামে। পিতা ডা. নন্দদুলাল পুরকাইত, মাতা দুর্গা রাণী পুরকাইত। জীবনের বিচ্যুত সময় শুরু শৈশবে। শৈশবের অপরিণত সময়ে চার বছর বয়সে মাতৃ বিয়োগ ও সাত বছর বয়সে পিতৃ বিয়োগ। বিদ্যালয় জীবনে শিক্ষক কবি দীপক হালদারের সান্নিধ্য কবিতা লেখার মূল প্রেরণা। কলেজ জীবনে "অন্বেষণ" পত্রিকা সম্পাদনা। "প্রসাদ", প্রতিকথা", " শৈলী শপথ" পত্রিকা থেকে পুরস্কার প্রাপ্তি। বিভিন্ন সময়ে "বাংলাদেশ জাতীয় কবিতা উৎসবে" যোগদান। প্রকাশিত গ্রন্থ - অনুভবে তোমার বৃষ্টি, ঢাকার আঁচল কলকাতার বাতাস, মঞ্জুলিকা নারী নয়(যন্ত্রস্থ)

এক অচেনা কবি : অরুণ মিত্র

                বিধানেন্দু পুরকাইত



                   


কবি অরুণ মিত্র আমার প্রাণের কবি, হৃদয়ের মানুষ।  তাঁকে আমার অন্তর উজাড় করা শ্রদ্ধা জানাই ।অনেক স্মৃতি মনে পড়ে কবি অরুণ মিত্রকে (আমার কাছে অরুণ'দা) নিয়ে । কবি রবীন বসু, এম, আমানুল্লাহ ও আমি "অন্বেষণ" নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করি। তখন আমার কলেজ জীবনের সবে শেষ, রবীনদা  ইউনিভার্সিটি। আমাদের বরিষ্ঠ সম্পাদক রবীনদা একদিন ফরমাস করলো যে, কবি অরুণ মিত্রের সাক্ষাৎকার নিতে হবে আমাকে।কবি অরুণ মিত্র থাকেন পিকনিক গার্ডেনে কুষ্টিয়া হাউসিং-এ।LA/20 তাঁর ফ্ল্যাট নম্বর। 

আমিও থাকতাম পিকনিক গার্ডেনে। কুষ্টিয়ার ঠিক কাছই পিকনিক সানরাইজ ক্লাবের পেছনে। তাই ঠিকানা খুঁজতে কোন অসুবিধা হলো না।একদিন সকালে দুরু দুরু বুকে অরুণ'দার ফ্ল্যাটের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।  একটা দ্বিধাও কাজ করছিলো ভেতরে ভেতরে।  আমার মত একটা গাঁইয়া তরুণকে তিনি পাত্তা দেবেন কিনা এই ভেবে। ফরাসী ভাষায় পন্ডিত কবি অরুণ মিত্র ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পুরস্কার "লিজিয়ন অফ অনার" সম্মানে ভূষিত হয়েছেন সবেমাত্র । আনন্দ বাজার, যুগান্তর প্রভৃতি সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে লেখা হচ্ছে। ওই সময় কলকাতার বুকে অন্য কোন সংবাদপত্র আর ছিল না। যাইহোক,  তাঁর ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপতেই ছোটখাটো চেহারার হাস্যময় একজন সুদর্শন মানুষ দরজা খুলে দিতে, আমি প্রণাম করে নিজের ক্ষুদ্র পরিচয়টুকু দিলাম। তিনি সাদরে আমাকে তাঁর লেখার ঘরে নিয়ে বসালেন।  ঠিক এই সময় ঘরে ঢুকলেন একটু লম্বা মহিলা ঘরোয়া সাজে। কবি অরুণ মিত্র তাঁকে বললেন, এ হলো "বিধান"।তিনি হেসে আমার কুশল জেনে,  এক কাপ চা দিলেন। তাঁকে প্রণাম করে কবির সাথে কথা বলছি। কখন দু'জনে দুজনকে ভুলে গেছিলাম নিজেদের ব্যবধান আজ আর মনে নেই। এক বটবৃক্ষের ছায়ায় নিজেকে সিক্ত করছি আপন খেয়ালে। 

সেই থেকে আমি ডাকতাম " অরুণ'দা" আর তিনি ডাকতেন "বিধান"।যে মহিলার কথা বললাম তিনি কবি অরুণ মিত্রের যোগ্য সহধর্মিণী শান্তি মিত্র। যাঁরা নাট্য জগতের মানুষ তাঁরা "নবান্ন" নাটকের কথা নিশ্চয়ই জানেন।  বিজন ভট্টাচার্যের এই নাটক আলোড়ন ফেলেছিল নাট্য জগতে।  সেখানে অভিনেত্রী যে তৃপ্তি মিত্রকে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম, পরবর্তী কালের বলিষ্ঠ অভিনেত্রী, শ্রদ্ধেয় শম্ভু মিত্রের স্ত্রী। কবি অরুণ মিত্রের সহধর্মিণী এই শ্রদ্ধেয় নারী শান্তি মিত্র ওই তৃপ্তি মিত্রের বড়দি। আনন্দবাজারে একদিন পড়লাম "নবান্ন" নাটকে শান্তি মিত্রও অভিনয় করেছিলেন। শান্তি'দিকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ভুল খবর, আমি সাহায্য করেছিলাম, কিন্তু অভিনয় করিনি।তখন আমার প্রায়ই অরুণ'দার ঘরে যাতায়াত।  বাড়ির ছেলে বলতে গেলে।  অরুণ'দার দাঁতের সমস্যা হতো।  তাই ঘনঘন দাঁতের ডাক্তারের কাছে যেতেন।  সুযোগ বা দরকার হলে আমাকে সাথে নিতেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে।  ছেলে আমেরিকায় আর মেয়ে গড়িয়াহাটের কাছে মেঘমল্লারের বাসিন্দা। তবে এখন জানলাম বর্তমানে তিনি গড়িয়া হাট রোডে "জয় জয়ন্তী" বাড়িতে থাকেন। সে যাইহোক, কুষ্টিয়া হাউজিংয়ে অরুণদা ও শান্তিদি শুধু থাকতেন।এই ফাঁকে বলি, অরুণ'দার ছেলে আমেরিকায় রিসার্চ করতে গিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে তিনি মত পাল্টে অরুণ'দাকে জানান যে, সারাজীবন 

ল্যাবরেটরীতে জীবন কাটানো সম্ভব নয়। তাই ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করতে চান। অরুণ'দার সম্মতি আদায় করে, সম্ভবত ইংরেজি সাহিত্যে পি, এইচ, ডি করে ওখানকার কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর চাকরি নেন। অরুণ'দার কথায়, যেটা আমেরিকা বলে সম্ভব হয়েছে, আমাদের দেশে সম্ভব হতো না। 

এমনই অনেক পারিবারিক গল্প করতেন প্রাণ খোলা ভাবে । কখনও শান্তিদিও যোগ দিতেন। এমনকি তাঁর মেয়ে জামাইয়ের কথাও বলতেন। জামাই সি, ই, এস, সি-র উঁচু পদে চাকরি করতেন। যেটা অরুণ'দার থেকে শোনা। একবার কোন এক নাট্যব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্র সদনে কোন অনুষ্ঠানে অরুন'দার সাথে অযাচিত ভাবে তর্ক জুড়ে দেন। অরুণ'দার মত নির্ভেজাল ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ ব্যাথিত হলেও চুপ করে ছিলেন। পরেরদিন শান্তিদি আমার কাছে উষ্মা প্রকাশ করলেও, অরুণ'দা নির্বিকার থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলে যান। 

একদিন সকালে গেছি। লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিহিত কবি দুঃখিত মুখে বললেন, জানো বিধান, আমার সেই প্রিয় কলমটা কাল থেকে পাচ্ছি না। (সেই সময় দামী কলম বা কোন কলমের প্রতি কোন কোন মানুষের দূর্বলতা থাকতো। এখন তেমন আছে কিনা আমার জানা নেই)। আমি তো অবাক। সেকি কলম কবি অরুণ মিত্রের টেবিল থেকে কি হবে!!! আমার বিমূঢ় মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, এক সাংবাদিক এসেছিল।তারপর থেকে কলমটা পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে তুমি চেনো। নাম বলবো না। 

অরুণ'দাকে সাক্ষাৎকার নেবার কথা বলতে অরুণ'দা বললেন, বিধান তোমার প্রশ্নগুলো লিখিতভাবে দাও, আমি লিখে উত্তর দেবো। কারণ, অনেক সাংবাদিক আমি যেটা বলিনি, সেটাও আমার মুখে বসিয়ে দিচ্ছে।আমার আপত্তি নেই।  তাই ঠিক হলো। আজ ভাবতে অবাক লাগে অতো ব্যস্ততার মধ্যেও আমার প্রায় কুড়ি পঁচিশটা প্রশ্নের উত্তর তিনি পরের দিনই নিজ হাতে লিখে দেন। লিখিত প্রশ্নের লিখিত উত্তর ছাপা হলো আমাদের গর্বের "অন্বেষণ "পত্রিকায়। 




সেই সংখ্যাটি যাদবপুর ইউনিভার্সিটির বিচারে শ্রেষ্ঠ লিটল ম্যাগাজিনের পুরস্কার পায়। তার চেয়েও যেটা আমার জীবনে গর্বের ও সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি, সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি শঙ্খ ঘোষ কবি অরুণ মিত্রকে নিয়ে লেখা একটি বই-এ আমার নেওয়া সাক্ষাৎকারটি ব্যবহার করেছেন। 

"অরুণ'দা আপনি যেখানেই থাকুন,  সুন্দর থাকুন শান্তিদির মত সহধর্মিণীকে নিয়ে।  আপনার মতো বটবৃক্ষের বড় অভাব বোধ করি প্রতি নিয়ত। হাজার প্রণাম আপনাকে। হাজার প্রণাম শান্তিদি আপনাকেও।

Comments

Popular posts from this blog

কবি প্রদীপ্ত সামন্ত

কবি মণিশঙ্কর

কবি দেবাশিস মন্ডল