দীপক হালদার
দীপক হালদার
জন্ম: এক আগস্ট, ঊনিশ শ পঞ্চাশ ।হরিণডাঙা, মথুরাপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ।
শিক্ষা: এম এ( বাংলা ভাষা ও সাহিত্য) বি এড,ডি ই এল টি ।
কবিতা লেখা শুরু ঊনিশ শ সাতষট্টি- আটষট্টি ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-মগ্ন শিকড়ে একা, আকরিক, হে অনঙ্গ উত্তরীয়, কে তুমি অনন্ত চোখে, মোহে মন্বন্তরে আছি,তোমাকে প্রসন্ন করি, ডুব সাঁতারের স্কুল, নির্বাচিত কবিতা ।'এই মুহুর্ত', 'অর্কেস্ট্রা' পত্রিকা দুটির অন্যতম সম্পাদক ছিলেন।সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন 'সুন্দরবন' ও The Heritage পত্রিকার।
এছাড়া অকাদেমি অব ফোকলোর এর শব্দ সংগ্রাহক প্রতিনিধি হয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ করার কাজ ও করেছি আটষট্টি সাল থেকে বায়াত্তর সাল পর্যন্ত ।
যে সমস্ত পত্র পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার কয়েকটি ::এক্ষণ, প্রতিক্ষণ, বারোমাস, অনুষ্টুপ, কবি সম্মেলন, কালপ্রতিমা, মহাদিগন্ত, বর্তিকা, কবি পত্র,কৃত্তিবাস, মাসিক কৃত্তিবাস, অমৃত, দেশ প্রভৃতি।
প্রাপ্ত পুরস্কারের কয়েকটি---(১) পন্ডিত মহেন্দ্রনাথ তত্ত্বনিধি পুরস্কার ও সম্মাননা (২)উত্তরবঙ্গ নাট্যজগৎ পুরস্কার ও সম্মাননা (শিলিগুড়ি)(৩)রেনল্ডস পূজা কবিতা পুরস্কার ( মাদ্রাজ)(৪)কবি কিশোরীমোহন নস্কর স্মৃতি পুরস্কার (৫)কবি বিনোদ বেরা পুরস্কার দুহাজার একুশ প্রভৃতি ।
কবিতা সতীন পছন্দ করে না: কবি বাসুদেব দেব
দীপক হালদার
নিয়ত তাঁর সঙ্গ পাই,অনুভব করি প্রতিনিয়ত, সর্বক্ষণ ।তিনি কবি বাসুদেব দেব । ছয়ের দশকের সর্বার্থে বিরল প্রজাতির কবি, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক,ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সুখপ্রদ প্রশাসক।ঊনিশ পঁচাত্তর ছিয়াত্তর সালের রবিবারের এক সুন্দর সকালে যুগান্তর, অমৃতবাজার, বসুমতী পত্রিকার সাংবাদিক শ্রীযুক্ত অনলকুমার মন্ডল ডায়মন্ড হারবারের নেহরু যুব কেন্দ্রের অফিসে তথা সেই সময়ে তাঁর বাসস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। তিনি তখন সদ্য সদ্য পা রেখেছেন নেহরু যুব কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে।আমাদের দেখা করার উদ্দেশ্য ছিল নেহরু যুব কেন্দ্রের সহযোগিতায় দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদের আয়োজনে একটি কবি সম্মেলন করা ।অনলদার কাছে আমার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন কবি বাসুদেব দেব ।জানিয়েছিলেন অনলদা,দীপক দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সংস্কৃতি পরিষদের সাহিত্য সংস্কৃতি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ।কথায় কথায় কবি বাসুদেব দেব সহমত পোষণ করেছিলেন ওই কবি সম্মেলন বিষয়ে ।জানিয়েছিলেন সমস্ত রকমে তাঁর সাহায্য পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে কিছু আর্থিক সহযোগিতাও।কিছুক্ষণ পরে অনলদা ব্যস্ততার কারণে বাসুদেববাবুর থেকে উঠতে চাইলে তাঁকে অনুমতি দিয়ে আমাকে বললেন ইচ্ছে থাকলে আমি আরও কিছুক্ষণ থাকতে পারি।ওই আরও কিছুক্ষণ আমাকে তাঁর গভীর আশ্রয়ের সুযোগ করে দিল চিরজীবনের মতো।সেই বটবৃক্ষের তলায়, সেই গাছের ছায়ায় আজও প্রতিমুহূর্তে শান্তিতে থাকি, সারাক্ষণ ।
সেদিন, সেই বিশেষ রবিবারের সকালে অনলদা চলে যাবার পর বাসুদেবদা জানতে চেয়েছিলেন আমি কি করি ? জানিয়েছিলাম অজ পাড়া গাঁয়ের একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াই।বাসুদেবদা পরক্ষণে ব'লেছিলেন, না না সাহিত্যের কি করা হয়?বলেছিলাম,চেষ্টা করি কবিতা লিখতে ।বাসুদেবদা পরক্ষণে বলেছিলেন সন্ধ্যাবেলা তাঁর বাসায় আসতে পারব কিনা ।হ্যাঁ বলাতে বলেছিলেন তখন যেন সঙ্গে কবিতা লেখার ডায়েরিটা থাকে ।তাঁর দিকে তাকিয়ে জানাই আমি তো ডায়েরিতে লিখিনা, লিখি নবলিপি বঙ্গলিপি জাতীয় লম্বা লম্বা খাতায়।বলেছিলেন সেই খাতাই নিয়ে যেতে ।সেইমতো সন্ধ্যায় হাজির হই সেদিন । আমাকে বসতে ব'লে ভিতরের ঘরে গেলেন তিনি একটু পরে একটা ঝাঁ চকচকে নতুন ডায়েরি এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন---- এটা তোমার ।পাতা উল্টে দেখি,লেখা---' শুধুমাত্র কবিতা লেখার জন্য দীপককে----, চির শুভার্থী বাসুদা।'তাঁর সেই শুভেচ্ছা আমার চিরদিনের পাথেয়। তিনি তার পর আমার কবিতার খাতা দেখে একটি কবিতা দেখিয়ে সেটাকে কপি করে দিতে বললেন তাঁকে ,বললেন ডায়মন্ডহারবারে নেহরু যুব কেন্দ্রের উদ্যোগে জেলা যুব উৎসব হবে, কলকাতার খ্যাতিমান কবিদের কবিতা নিয়ে সেই উপলক্ষে প্রকাশিত হবে একটি স্মারক গ্রন্থ ।সেখানে থাকবে এই কবিতাটি। জানতে চেয়েছিলেন প্রিয় কয়েকজন কবির নাম।বলার পর জিজ্ঞেস করলেন আমি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পড়েছি কিনা ।নেতিবাচক জবাবে বাসুদেবদা তাঁর বইয়ের তাক থেকে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতাগ্রন্থ দিয়ে বললেন বইটি ভালো করে পড়ে ফেরত দিতে ।বললেন কবিতা লিখতে হলে পড়তে হবে অনেক বেশি ।যখন যা পাওয়া যায় পড়ে ফেলতে হবে নির্দ্বিধায় ।উপদেশের মত করে জানিয়েছিলেন কবিতা হলো আগুন ।সব কিছুই তার কাছে গ্রাহ্য ।সমস্ত বিষয় থেকে সংগ্রহ করতে হবে তার উপাদান ।একমুখীনতা এ বিষয়ে খুবই জরুরি ।বন্দুকের গুলির মতো, ধনুর্বাণের মতো তার একমুখীনতা ।তার একমাত্র লক্ষ্যভূমি কবিতার চাঁদমারি ।তাকে বিদ্ধ ক'রে তবেই শান্তি, তবেই স্বস্তি ।উপদেশ দিতে দিতে বলেছিলেন 'মনে রেখো, কবিতা সতীন পছন্দ করেনা ।তাকে সব দিতে হবে, স- - - ব।তনু মন সব দিয়ে তাকে বরণ করতে হবে, টেনে নিতে হবে কাছে ।নইলে সে কিছুতেই তোমার হবেনা ।আবার অন্যভাবে বোঝাতে চেয়ে বললেন-- 'কবিতা হলো সাতমহলা বাড়ির রানী ।তুমি গিয়েছ তাঁর কাছে, দেখা করতে চাও।কিন্তু তিনি দেখা করবেন কেন?।আধ ময়লা ধুতি পাঞ্জাবী পরা বা পাজামা পাঞ্জাবী পরা কাঁধে ঝোলা উস্কোখুস্কো চুলের তোমাকে দেখে রানির পাহারাদাররা বারবার ফেরত পাঠাবে তোমাকে ।কিন্তু তুমি ছাড়বে কেন,কেন ভেঙে পড়বে তুমি ।তোমার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, তোমার ঐকান্তিক একাগ্রতার জয় একদিন হবেই হবে ।রানিকে একদিন ঠিক বেরিয়ে আসতে হবে প্রাসাদ প্রকোষ্ঠ থেকে, দেখা করতেই হবে তোমার সঙ্গে ।সেদিনই তোমার কবিতা লেখা সার্থক হবে, যোগ্য মর্যাদায় পৌঁছনো হবে কবিতার দরবারে ।স্বদেশী বিদেশি সাহিত্য কবিতার বই পড়বে একাগ্রচিত্তে,ডুবে যেতে হবে সেসবের মধ্যে ।ভাবো তো জীবনানন্দের কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা।কবিগুরুর গান, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিঠিপত্র, কাজকর্মকে অনুসন্ধিৎসার চরম দিয়ে ছুঁতে হবে, আচ্ছা, জীবনানন্দের 'বোধ' কবিতার কথাগুলো মনে করো,ভাবো তো! কি অসাধারণ ।এভাবেই বাসুদেবদা প্রতিনিয়ত জাগাতে চেষ্টা করেছেন ।মনের প্রাণের সবটুকু দিয়ে কবিতাকে গ্রহণ করতে তোমার চেষ্টার খামতি যেন না থাকে,যেন ঘাটতি না থাকে একটুও।বলতেন, যারা কবিতা লেখে তাদের জন্য তাঁর দরজা সবসময় খোলা, উন্মুক্ত ।তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই, মধ্যরাত, সন্ধ্যা, সকাল, দুপুর, বিকাল--- কবিতা শুনতে তিনি সর্বদা প্রস্তুত ।আরও বলেছিলেন প্রত্যেক রবিবার সকালে তাঁর বাসায় যেতে ।অবশ্য তার জন্য একটি শর্ত, সাত দিনে অন্তত সাতটি নতুন কবিতা লিখে নিয়ে যেতে হবে ।গেলে চা বিস্কুট, বা অন্যান্য স্ন্যাকস, মিস্টি ( বাড়িতে থাকলে) পাওয়া যাবে ।কবিতা ঠিকমতো না হলে চড়চাপড়।এভাবেই বাসুদেবদার স্নেহ ভালোবাসার লালন ঝরে পড়ত অনায়াসে
আমার সংগ্রহে বইয়ের সংকুলান তেমন না থাকায় নিজের সংগ্রহ থেকে পড়তে দিয়েছেন অজস্র বই।মজা ক'রে বলেছেন তাঁর বইগুলো বেড়াতে ভালোবাসেনা কিন্তু আত্মীয়ের বাড়িতে তো যেতেই হয়।আবার ছদ্ম শাসনের ছলে বলেছেন বই ফেরতের সময় পড়া ধরব ।কিরকম আদর যত্ন হলো আত্মীয় বাড়িতে সে তো জানতেই হবে, তবেই না পরের বার যাওয়া ।
এরকম করে প্রায়শ আগলে রাখতেন আমাকে, আমার মতো আরও অনেককে।একসময় তাঁর একটি কবিতা গ্রন্থ আমাকে উপহার দেওয়ার সময় বইটিতে লিখে দিয়েছিলেন-----'যাহারা কবিতা লেখে তাহাদের দুঃখ বড়ো বেশি ।স্নেহের দীপককে------- শুভার্থী বাসুদা।
যখন শারদীয়া এক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো আমার কবিতা ,আমাকে নিয়ে ছুটলেন কলকাতা ।সেখানে প্রথমে গেলেন টেমার লেন -এ, দেবুদার ( দেবকুমার বসু, সময়ানুগ ও দর্শক পত্রিকার সম্পাদক, বিশ্বজ্ঞান প্রকাশনীর কর্ণধার) কাছে ।কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে হাজির কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি রবীন সুর,কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত প্রমুখ কবিগণ।শক্তিদা অমিতাভদা,রবীনদা, দেবুদাকে আমার পরিচয় দিয়ে জানালেন, এ হলো দীপক হালদার ।ডায়মন্ডহারবারে থাকে, এবার এক্ষণ শারদীয়ায় কবিতা লিখেছে।কথা বললেন শক্তিদা------'নির্মাল্য তোকে সাম্মানিক দিয়েছে? আমি না বলাতে, শক্তিদা দেবুদার থেকে একটু কাগজ-কলম নিয়ে খসখস ক'রে কি লিখলেন ।লিখে আমাকে বললেন তলায় সই করে দিতে ।কি লেখা পড়তে যাব,শক্তিদা বললেন কি আর আছে তোর যে লিখে নেব,নে সই কর।সই করা হয়ে গেলে বাসুদেবদাকে বললেন, বাসুদেবদার গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।একটু পরে ফিরবেন ।সত্যি সত্যি ফিরলেন একটু পরে।তখন তাঁর দুবগলে দুটো মদের বোতল ।বললেন, নির্মাল্যর থেকে দীপকের টাকা নিয়ে এগুলো এনেছি, দীপকের এক্ষণে লেখা সেলিব্রেট করা হবে ।আজ দীপক প্রথমে খাবে তারপর আমরা ।প্রমাদ গুণে বাসুদেবদাকে বললাম- বাঁচান।বাসুদেবদা শক্তিদাকে বললেন--- ও একটা বিড়ি, সিগারেট খায়নি আজ পর্যন্ত, ও মদ খাবে কি ক'রে! শুনে শক্তিদা বললেন তুই কবি হবি কি করে? তোর আর কবি হওয়া হলনা।এরকম অজস্র ঘটনার সাক্ষী বাসুদেবদার সঙ্গ ।যা শেষ হবার নয়।তবু তো একসময় শেষ করতে হয় কথা ।সেই শেষের দিকে এগিয়ে যেতে তুলে ধরব
বাসুদেবদার লেখা চিঠি থেকে কয়েকটি বাক্য, যা তিনি লিখেছিলেন একান্ত আমাকে---------''যখন বাড়ি জ্বলে,মানুষ মানুষকে মারে,পথে রক্ত আর আতংক লেখা থাকে তখন কবি কি গাছপালা নদী বাতাস হৃদয়াবেগের কাহিনী রচনা করবে? ব্রেশট বলেছেন এমন ব্যবহার কবির পক্ষে পাপ।''---------------- ----------------------------'' সাফল্য কাকে বলে কবিকে জানতে নেই ।আত্মদহন ও আত্মখননই তার কাজ ।মোমের মতো সে জ্বলে একলা ঘরে।''
তাঁর সুদীর্ঘ চিঠি থেকে একটু তুলে ধরলাম মাত্র ।
আজ এই পর্যন্ত ।বাসুদেবদা, কবি বাসুদেব দেবের সঙ্গচ্যূতি ঘটবেনা আমার কোনোদিন, কখনো ।প্রতিনিয়ত সেই সঙ্গ পেয়ে আমি সমৃদ্ধ হই,রসদ পাই বেঁচে থাকার ।





চমৎকার স্মৃতিচারণ!
ReplyDelete